শেষ চিঠি আর প্রেমের সূচনা


একজন প্রফেশনাল এবং সফল ব্লগার হিসাবে নিজের পজিশন ধরে রাখতে অদম্য ছুটে চলেছি। অনেক দূরে ছুটে গিয়েছি ফটোশুটের জন্য, লিখেছি অনেক বিষয়ে। কিন্তু এবার লিখব একটু ভিন্ন বিষয়ে, আর এর জন্য যে ছবি লাগবে, সে জন্য ফিরে যাব ১৩ বছর আগে ফেলে আসা আমাদের সেই গ্রামে। বিষয়টা বেশকিছুদিন থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই আজ সকালে ব্যাগপত্র গুছিয়ে এগিয়ে চলেছি গ্রামের উদ্দশ্যে। গ্রামের সব কিছু আমার মনে নেই। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে গ্রামে যাওয়া হয় নি। জানি না বাবার সাথে তার পরিবারের কি হয়েছিল, যার জন্য ভূলেও আর গ্রামে আসেন নি।
ঠিক আসরের ওয়াক্তে পৌছে গেলাম তমালতলি। মাঠের মধ্যদিয়ে কাঁচা রাস্তা, আর রাস্তার পাশে ছোট ছোট কুড়ে ঘর। গ্রামের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে গ্রামের নারী-পুরুষ উভয়ই বেশ পরিশ্রমী। মেয়েরা দল বেধে মাঠ থেকে ফিরে আসছে, কিছুলোক পা টেনে এগিয়ে চলেছে মসজিদের দিকে, চারিদিকে সবুজ আর সবুজ, সজীব স্বতেজ বাতাস, সব মিলিয়ে ওসাম। সব প্রাকৃতিক দৃশ্য ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করছি আর এগিয়ে চলেছি। অবশেষে পৌছালাম আমাদের গ্রামের বাড়িতে। ছোট চাচা এখানে থাকেন। বাড়ির পরিবেশ আর সবার আগ্রহ দেখে কিছুদিন থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
রাতের খাবার পরে, ক্যামেরার ছবি গুলো ল্যাপটপে চেক করছিলাম। হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে আসলো হিজাবে মুড়ানো সাদাসিদা অচেনা মুখ। টানা টানা চোখ, চোয়ালে লেগে থাকা হালকা ধুলি-কাদা, সবমিলিয়ে অন্যরকম আকর্ষণ। কে এই মেয়ে? আর একে দেখে আমি হঠাৎ চমকে উঠলাম কেন?
পরেরদিন বিকালে বেরিয়ে পড়লাম প্রয়োজনীয় ফটোশুটের আর সেই অচেনা মুখের সন্ধানে। অবশেষে খুজে পেলাম তাকে। আবিরাহ! খুব সুন্দর নাম। কেন জানি না এই মেয়েটির প্রতি অন্যরক ভালোলাগা কাজ করছে। দূর থেকে আবিরাহকে অনুসরণ করলাম বেশ কিছু দিন। এরপর আবিরাহর সামনে দাড়ালাম ভালোবাসার শুভেচ্ছা নিয়ে। কিন্তু আবিরাহর চড়া জবাব শুনে থমকে গেলাম।
“আমি তো আপনাকে ভালো করে চিনি না, তাছাড়া আপনি কি জানেন না বিয়ের আগে প্রেম বা এই টাইপের যে কোনো সম্পর্ক হারাম এবং বিয়ের পরে এই সম্পর্ক শুধু হাসব্যান্ড ওয়াইফের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ”
অতঃপর সবার সম্মতিতে খুব সাধারণভাবে বিয়ে হল আমাদের। ভালো লাগার কাউকে আপনকরে পাওয়ার সুখ অন্যরকম। ভাবলাম আরো কিছুদিন গ্রামে থাকবো এরপরে আবিরাহকে নিয়ে ফিরে যাব শহরে। আবিরার সাথে আমার প্রথম রাত, আবিরাহর হাত খুব শক্ত করে ধরে বললাম “আবিরাহ, তোমার সাথে আমার নতুন জীবনের পথ চলা শুরু। আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং তোমাকে ধরে রাখতে চাই সারা জীবনের জন্য।”
আবিরাহর কাছ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। জানি না কি হয়েছিল, যার কারনে কথা বলে নি সারা রাত। অনেক বার জানতে চেয়েছি। উত্তর পাই নি। কত স্বপ্ন, কত আশা নিয়ে এই মধুর রাতে হাজির হয়েছিলাম আবিরাহর সামনে। কিন্ত সব কিছু ভেঙে খান খান হয়ে গেল। পরের দিন সকালে আবিরাহকে ডেকে বললাম, “আমি শহরে চলে যেতে চাইছি, তুমি কি যাবে আমার সাথে?” উত্তর পেলাম না। সেদিন খুব রাগ হয়েছিল আবিরাহর প্রতি।
সেই চলে এসেছি আবিরাহকে ছেড়ে আজ দুবছর হল। কর্মব্যস্ততার চাদরে আবিরাহকে আড়াল করে রেখেছি জীবন থেকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার উচিত ছিল আবিরহকে আরো কিছু সময় দেওয়া, তাকে বোঝা, আর শিখিয়ে দেওয়া কিভাবে ভালোবাসতে হয়। কেন জানিনা ওর প্রতি তীব্র অভিমান জমে ছিল। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে যখন আবিরাহর চিঠি পেলাম, তখন রীতিমত অবাক হলাম। ভালোবাসার চিঠি। একজন মানুষের ভালোবাসা প্রকাশের ধরন এত সুন্দর হয়, সেটা আবিরাহার চিঠি না পড়লে হয়ত বুঝতে পারতাম না। মন চায় আবিরাহর কাছে ছুটে যায়, কারন যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে ছাড়া সুখ খোজা এক প্রকারের ব্যর্থ চেষ্টা।
আজ আবার ছুটে চলেছি তমালতলির উদ্দেশ্যে সেই চেনা পথ ধরে। বাড়িতে ঢুকতেই আবিরাহর চোখে চোখ পড়ল। খুব চেনা সেই মায়াবী চোখ, যার মধ্যে আমি নিমিষে হারিয়ে যাব। আবিরাহ দৌড়ে এসে আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, ওটাই ছিল তোমাকে লিখা আমার শেষ চিঠি। আর কোনোদিন লিখব না। কারন, আমার কাছ থেকে তোমাকে একদিনের জন্যও আর দূরে থাকতে দেব না।
আমিও খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।আর তখন আবিরাহ আমার কানে ফিসফিস করে বলল, “তোমার সাথে আমার নতুন জীবনের পথ চলা শুরু। আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং তোমাকে ধরে রাখতে চাই সারা জীবনের জন্য।”



Previous
Next Post »